
ঝুলন্ত পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু-আইজেনকট টানাপোড়েন, নতুন নির্বাচন এড়াতে সমঝোতার ডাক হারজগের
ছবিঃ সংগৃহীত
গত সপ্তাহের নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ বুধবার আরও জোর দিয়ে তুলেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ অবশ্য আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক সমঝোতার।
জেরুজালেম থেকে এএফপি জানায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইলে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনের এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। গভীরভাবে বিভক্ত দেশটিতে সরকার গঠনের সুযোগ আগে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পাবেন, নাকি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট—সে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনিই।
একটি প্রধান আরব দলের সমর্থন পাওয়া আইজেনকট অঙ্গীকার করেছেন, প্রধানমন্ত্রী হলে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অংশীদারিত্ব আরও গভীর করবেন। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
নেতানিয়াহুর অভিযোগ, ‘ইসরাইলের নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে বলে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।’
আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন নেতানিয়াহু; এসব দল একজোট হলে আইজেনকটের সরকার গঠনের পথ খুলে যেতে পারে। নির্বাচনের দিন নগদ অর্থভর্তি খামসহ কয়েকজনের গ্রেপ্তারের ঘটনা সামনে এনেছেন তিনি, যদিও কর্তৃপক্ষ এগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলছে। কয়েকজন নেতা কাতারের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন নেতানিয়াহু; একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে তাঁর নিজের সহযোগীদের বিরুদ্ধেও।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এ অবস্থায় হারজগ বলেছেন, দুই পক্ষকেই মেনে নিতে হবে যে ‘সব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব নয়’। নতুন নির্বাচন এড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি।
হারজগ বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচনের পর যখন কোনো স্পষ্ট বিজয়ী নেই, তখন আমি সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী চিন্তা, সাহস এবং সদিচ্ছার আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে ইসরাইল রাষ্ট্রই বিজয়ী হয়।’
এবারের নির্বাচনে আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর যেসব ফিলিস্তিনি সেখানে থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের বংশধররাই দেশটির আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বড় অংশ। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী সরকারের কঠোর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে তাঁরা প্রায়ই ক্ষোভ জানিয়েছেন।
সাধারণত আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনকারী প্রেসিডেন্ট হারজগ কারও নাম না নিয়ে জানান, ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর ‘গভীর শ্রদ্ধা’ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা যে অশালীন ও বর্ণবাদী বক্তব্য শুনেছি, আমি তার নিন্দা জানাই।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অংশীদারিত্ব
নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের বিভাজনমূলক শাসনের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করা সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের অংশীদারিত্ব ‘নতুন করে গড়ে তোলা ও আরও গভীর’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে থাকা দ্বিদলীয় সমর্থন জোরদারের কথাও বলেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলকভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করছি।’ আরও বলেন, ‘একসঙ্গে আমরা অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থ এগিয়ে নিতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের সমৃদ্ধির নতুন পথ খুলে দিতে পারি।’
বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা চলতি বছরের শেষ নাগাদ বন্ধ করতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে একমত হওয়ার কথা ট্রাম্প ঘোষণা করার পর এ নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই আইজেনকটের এই বক্তব্য এল।
প্রধান আরব-ইসরাইলি দল রা'আম আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সরকার গঠনে আইজেনকটকে সমর্থন দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে বৈঠকের আগেই এ ঘোষণা দেয় দলটি।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে নতুন যুদ্ধ শুরু না করতে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছেন আইজেনকট। তাঁর মতে, এমন যুদ্ধ নেতানিয়াহুকে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সুযোগ করে দিতে পারে, কিংবা নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সময়ক্ষেপণের পথ খুলে দিতে পারে।
বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা বলছেন, মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো করেছে। গাজা যুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘিরে ক্ষোভের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ইসরাইলের প্রতি আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
বিরোধী জোটের সবচেয়ে বামপন্থী দলটির প্রধান ইয়ার গোলান বলেন, ‘নেতানিয়াহু ও (ইতামার) বেন-গভিরের ক্ষমতায় থাকা অব্যাহত থাকলে ইসরাইল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের পথে যেতে পারে।’
নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ৯ হাজার ৬৯টি ভোটকেন্দ্রের ভোটের হিসাব নিরীক্ষা করেছে; তাতে ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো প্রমাণ মেলেনি। বিদায়ী পার্লামেন্টের গঠন অনুযায়ী প্রতিনিধিত্বকারী এই কমিটি ১৫-২ ভোটে ফল অনুমোদন করে; ভোটদানে বিরত ছিলেন ১৪ জন সদস্য।
ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ বাড়ানোর পক্ষে উসকানিমূলক বক্তব্যের জন্য পরিচিত অতি জাতীয়তাবাদী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভির বলেছেন, তাঁর দল নির্বাচনের ফল মেনে নেয়নি। আরব-ইসরাইলি দলের নেতাদের গ্রেপ্তারের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
ইসরাইলের কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিদেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগে আরব আইনপ্রণেতা আয়মান ওদেহর বিরুদ্ধে তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ। তিনি বৃহত্তম আরব রাজনৈতিক জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর সদস্য। এক বিবৃতিতে জোটটি এ ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক হয়রানি’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
আইজেনকটের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী ইসরাইলের গণতন্ত্রকে ‘দুর্বল করার’ চেষ্টা করছেন এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে জনমনে বিদ্বেষ উসকে দিচ্ছেন। ১৯৯৫ সালে নিহত প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রবিনের হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকী স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘ইসরাইল রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক আচরণের সীমার অনেক বাইরে এক অন্ধকার অতল গহ্বরে টেনে নেওয়ার সুযোগ আমরা দেব না।’
প্রেসিডেন্ট হারজগ প্রথমে দুই দিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর সরকার গঠনের জন্য একজন প্রার্থীকে ২৮ দিন সময় দেবেন; প্রয়োজনে এই সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
প্রেক্ষাপট
রোজা অ্যান্ড রুবিনি অ্যাসোসিয়েটসের ২০২৬ সালের ২৫ আগস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট ৩০ জুন ‘ইয়াশার’ নামে নতুন দল গঠন করেন।
সংখ্যার হিসাব
টাইমস অব ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ শতাংশের কিছু বেশি ব্যালট বাক্স গণনা শেষে লিকুদ নেতৃত্বাধীন জোটের আসন দাঁড়ায় ৫৬, আর আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের ৪৯ — আল জাজিরা ২৮ অক্টোবর এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাসস
প্রেক্ষাপট সূত্র: রোজা অ্যান্ড রুবিনি অ্যাসোসিয়েটস, ২৫ আগস্ট ২০২৬; আল জাজিরা, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
